
বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামে ডলার কেনার পর প্রধান বিদেশি মুদ্রাটির দর বাড়তে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ব্যাংকগুলো ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার বেচছে। আগের দিন এ দর ছিল ১২০ টাকা ১০ পয়সা। রোববার ব্যাংকগুলো ডলার বেচে ১২১ টাকা ২০ পয়সা দরে।
ডলার দর কমতে থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো রোববার নিলামে ডলার কেনে। সেদিন ১৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও বেশিরভাগ ব্যাংক দাম হাঁকে ১২০ টাকার বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ডলারের দর পড়তে থাকায় বাজার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে রোববার নিলামে এই বিদেশি মুদ্রা কেনা হয়। এর পরদিন থেকে ব্যাংকের পাশাপাশি খোলা বাজারে ডলারের দর বাড়ার তথ্য আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোমবার বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে ১২০ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২০ টাকা ৮০ পয়সা দরে রেমিটেন্সের ডলার কিনেছে ব্যাংকগুলো। আগের দিন এ দর নেমেছিল ১১৯ টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “রোববার নিলামে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮টি ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনেছে। তাতে সোমবার ডলারের দাম বেড়েছে।”
তিনি বলেন, “ডলার দর কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। আবার অনেক বেড়ে যাওয়াও ভালো নয়।
“তাই দর কমলে কিংবা বাড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে তা স্থির রাখবে।” এক প্রশ্নের জবাবে আরিফ খান বলেন, “অর্থনীতিতে সবকিছু নির্ভর করেছে চাহিদা-যোগানের ওপর। যোগান বেশি থাকার কারণে ডলার দর কমেছে। “তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে নিয়েছে। তাই দাম আগের চেয়ে একটু বেড়েছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রতিদিনই ডলার কেনা হবে- এমন নয়। বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী যখন প্রয়োজন মনে করা হবে, তখনই আমরা এভাবে অকশনের (নিলামের) মাধ্যমে ডলার কিনব।”
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের অর্থ পেতে ১৪ মে ডলারের বিনিময়মূল্য বাজারভিত্তিক করার ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এতে ডলারের দাম বাড়েনি।
আগের চেয়ে শর্ত শিথিল করার পর বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা কাটিয়ে প্রথমে কিছুদিন একই জায়গায় ঘুরপাক খাওয়ার পর গত দেড় সপ্তাহ থেকে তাতে কিছুটা নিম্নমুখী ভাব দেখা যায়। এর কারণ হিসেবে রেমিটেন্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার কথা বলছেন ব্যাংকাররা। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমায় সেভাবে ডলার খরচ হচ্ছে না বলেও তুলে ধরেন তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দর দিচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “ডলারের দাম যেভাবে কমছিল, তাতে বাজার প্যানিকড হয়ে গিয়েছিল।
“যেহেতু আমাদের ডলারের প্রবাহ ভালো, সেহেতু এই দর আরও কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।”
তিনি বলেন, “ডলারের দাম কমে গেলে আমদানিকারকরা উপকৃত হলেও রপ্তানিকারক ও রেমিটেন্স পাঠানো প্রবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। সেক্ষেত্রে হুন্ডিতে চলে যাওয়ার হুমকিও তৈরি হত।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঝে কয়েক মাস রেমিটেন্সে উল্লম্ফনের পাশাপাশি রপ্তানি আয়ের প্রবাহ বাড়ায় ডলারের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। এর সঙ্গে জুনে আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে অর্থ ছাড় হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বড় অঙ্কের ডলার আসে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান বলেন, “আমদানি এলসি খোলার চাহিদা না থাকায় ডলারের চাহিদাও বাড়ছে না। বর্তমানে বিনিয়োগ অনেক কম হচ্ছে, আর কমলে মূলধন যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য পণ্য আমদানি কমে যায়।”
তিনি বলেন, “এখন যা আমদানি হচ্ছে, তার একটা বড় অংশই নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য। সরকারের তেল, জ্বালানি ও খাদ্যশস্য। তাছাড়া আগে আমদানির বকেয়া ছিল, বর্তমানে তা নেই। তাতে খুব দ্রুত ডলারের চাহিদা বাড়ার কথা না।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডলার দর ১২২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে রাখার ভাবনা তাদের। এ দরের চেয়ে কমলে বা বাড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “ডলার দর অনেক কমে যাওয়া কিংবা বেড়ে যাওয়া- কোনোটাই ভালো না। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। এতে রেমিটেন্স ও রপ্তানিকারকদের জন্য ভালো হবে।”
দুই নিলামে কিনল ৪৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মত নিলামে ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিন ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে তারা কেনে ৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এ নিয়ে দুই নিলামে ৪৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার কিনল বাংলাদেশ ব্যাংক। দ্বিতীয় দিনে কেনা ডলার বুধবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যোগ হবে। দ্বিতীয় দফার নিলামের তথ্য সাংবাদিকদের দেন আরিফ হোসেন খান।
