
শেষপর্যন্ত তৃতীয় দফার আলোচনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত বাড়তি শুল্কের হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এটিকে তাদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করছে। অর্থনীতিবিদদেরও অনেকে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বলেই মনে করছেন।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পরিবর্তন বা শুল্ক কমানোর পেছনে বাংলাদেশকে কতটা ছাড় দিতে হয়েছে, বিনিময়ের বিষয় কী হতে পারে, এসব প্রশ্নে কোনো পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।
অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাড়ানোর কৌশলের ক্ষেত্রে বাণিজ্যের পাশাপাশি ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক চিন্তাও ছিল। বাণিজ্যের বাইরের বিষয়গুলোয় বাংলাদেশ কিভাবে সামলেছে বা কী অবস্থান তুলে ধরেছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আগের দুই দফা আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ‘গোপন চুক্তি’ করার অভিযোগ উঠেছিল। সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা অবশ্য সমঝোতার স্বার্থে আলোচনার অনেক বিষয় গোপন রাখার কথা বলেছিলেন।
সে কারণে এখন প্রশ্ন উঠছে, শুল্ক কমানোর ক্ষেত্রে শেষপর্যন্ত সমঝোতা হলো কিসের ভিত্তিতে, বাংলাদেশ ছাড় দিলো কোথায়?
তবে শুল্ক কমার বিষয়টি গার্মেন্টস শিল্পসহ ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তির বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন।
কারণ বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া সব পণ্যের ওপর আগে থেকেই গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এর সঙ্গে পাল্টা ৩৫ শতাংশ শুল্ক যোগ হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে বড় অংকের অর্থ্যাৎ মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক গুনতে হতো বাংলাদেশকে।
সেখানে এখন পুরাতন ১৫ শতাংশ এবং নতুন ২০ শতাংশ মিলিয়ে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে মোট ৩৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে শুরুতে যে হারে বাড়তি শুল্ক বসানোর কথা ছিল, তা বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদস্বরূপ ছিল। কারণ ওই বাড়তি শুল্কের কারণে অনেকের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। কিন্তু ওই শুল্ক এখন ২০ শতাংশে নেমে আসার ফলে “মহাবিপদ সুযোগে পরিণত হয়েছে”, বিবিসি বাংলাকে এমনটাই বলছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস শুল্ক কমানোর চুক্তিকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি এটিকে “সুস্পষ্ট কূটনৈতিক সাফল্য” বলে উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা না হলে পহেলা অগাস্ট থেকে বাড়তি ৩৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করার কথা বলা হয়েছিল। এখন সেই শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা সম্ভব হলো।
কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারতের পণ্যে বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্কআরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ভারত ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের বড় প্রতিদ্বন্দ্বি। কিন্তু ওই দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশের প্রায় সমতুল্য, অর্থাৎ গড়ে ১৯ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক হার ধার্য করা হয়েছে।
এই বিষটিকেই ইতিবাচকভাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
তিনি মনে করছেন, তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে চামড়া শিল্প, সব খাতের বাজার বিস্তৃত করার এটাই সুযোগ। কারণ ভারতের জন্য শুল্ক হার বেশি হওয়ার ফলে বায়াররা গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে সে দেশে বাণিজ্য করতে বেশি আগ্রহী হবে না।
আর পাকিস্তানের জন্য শুল্ক হার ১৯ শতাংশ হলেও “এক শতাংশের সুবিধা পাওয়ার জন্য বায়াররা পাকিস্তানে যাবে না। কারণ পাকিস্তানের সেই সরবরাহ ক্যাপাসিটি নেই। পোশাক শিল্প প্রমাণিত শিল্প। এই এক শতাংশের জন্য বাংলাদেশের মতো নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী বাদ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের কাছে যাবে বলে মনে হয় না,” বলছিলেন জাহিদ হোসেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলও মনে করেন, গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাড়তি শুল্কআরোপের আগে যেসব দেশ বাংলাদেশের প্রতিযোগী ছিল, প্রতিযোগী হিসাবে এখনো তারাই আছে।
“পাল্টা শুল্কের আগে সবাই সমান ছিল, এখনও সবাই সেখানে আছে। শুধু ভারতের সাথে পার্থক্য আছে। কিন্তু ভারত বাড়তি ব্যবসা খুব বেশি নিতে পারবে না। আর চীনের ব্যবসা বাংলাদেশের দিকেই থাকবে। সামগ্রিক চিন্তা করলে এখানে নেগেটিভ হওয়ার সুযোগ নেই” বলেন মহিউদ্দিন রুবেল।
