বঙ্গোপসাগরের বুকে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন বহুদিন ধরেই টিকে থাকার লড়াই করছে। প্রবাল মরছে, সামুদ্রিক কচ্ছপের আবাস ভেঙে যাচ্ছে, বর্জ্য ও পয়ঃদূষণে প্রাণ হারাচ্ছে দ্বীপ। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের চাপ, আগ্রাসী নির্মাণ আর অব্যবস্থাপনা মিলিয়ে দ্বীপের নাজুক বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়েছে।
এদিকে দীর্ঘদিনের এ সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রথমবারের মতো দ্বীপটি রক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ, বৈজ্ঞানিক, আইনসম্মত মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে প্রস্তুত হওয়া এ পরিকল্পনায় সেন্টমার্টিনকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন’ হিসেবে পুনরায় চিহ্নিত করা হয়েছে।
মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গতকাল সোমবার উন্মুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর, সংস্থা, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিকদের আগামী ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে ইমেইলে মতামত পাঠাতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, মতামত নিয়ে সেন্টমার্টিনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে। প্রকাশিত খসড়ায় দ্বীপকে কীভাবে ধাপে ধাপে পুনরুদ্ধার করা হবে, কোথায় সংরক্ষণ কঠোর হবে, কোথায় পর্যটন সীমিত করা হবে, কীভাবে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা যায়– সবই উল্লেখ করা হয়েছে।
মাস্টারপ্ল্যানের জরিপে দেখা গেছে, সেন্টমার্টিনে রয়েছে ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির কম্ব জেলি, ১২ প্রজাতির কাঁকড়া, ২৬ প্রজাতির শামুকসহ ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক জীব। এগুলোর ওপরই দ্বীপের সামুদ্রিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সব ক্ষেত্রেই দ্রুত অবনতি ধরা পড়েছে। দ্বীপে ১২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। কিন্তু হোটেল-কটেজ নির্মাণ ও স্থানীয় জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় এ সংখ্যা দ্রুত কমছে।
দ্বীপের সবচেয়ে বড় সংকট চিহ্নিত হয়েছে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ। হিসাব বলছে, সেন্টমার্টিন দিনে সর্বোচ্চ ৯২৬ জন পর্যটক বহন করতে পারে। অথচ মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আট হাজার পর্যটক দ্বীপে ঢোকেন। অতিমাত্রায় ভিড়ে প্রবাল ভেঙে চূর্ণ হয়, সামুদ্রিক ঘাস নষ্ট হয়, কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান হারিয়ে যায়, দূষণ বাড়ে। মহাপরিকল্পনার খসড়ায় এটিকে গুরুতর ঝুঁকি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মাস্টারপ্ল্যান চারটি প্রধান লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। এগুলো হলো– বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক সম্পদ ও জীবিকা সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো। সেন্টমার্টিনের প্রাণ ফেরাতে মাস্টারপ্ল্যানে দিনে সর্বোচ্চ ৯০০ পর্যটকের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দ্বীপে ভ্রমণে যেতে লাগবে আগাম নিবন্ধন। মাস্টারপ্ল্যানে সেন্টমার্টিনে জেনারেটর নয়, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণেও সরকার কাজ করবে।
মাস্টারপ্ল্যানে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাল পুনরায় উৎপাদন করা হবে। পরে নির্দিষ্ট এলাকায় প্রতিস্থাপন করা হবে। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মনিটরিং ও রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ওপর থাকবে আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি।
মাস্টারপ্ল্যানে সেন্টমার্টিনকে চারটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। জোন-১-কে নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মাল্টিপল ইউজ জোন’ হিসেবে, যেখানে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অনুমোদন দেওয়া যাবে। জোন-২-কে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে সংবেদনশীল এলাকা রক্ষায় ‘বাফার জোন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জোন-৩-এ জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে। কিন্তু এখানে শর্ত সাপেক্ষে স্থানীয়রা প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে পারবে। জোন-৪-এ কঠোরভাবে প্রকৃতি সংরক্ষণ করা হবে। এখানে সব ধরনের প্রবেশ ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে।
সুত্রঃ সমকাল
