
মালয়েশিয়াতে নতুন করে কর্মী পাঠাতে সিন্ডিকেট মুক্ত এবং কর্মীদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বান জানিয়েছে অভিবাসীকর্মীদের নিয়ে কর্মরত ২৩টি সংগঠনের জোট বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি ফর মাইগ্রেন্টস (বিসিএসএম)। বৃহস্পতিবার (৮ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে বিসিএসএম আয়োজিত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে একটি পরামর্শক সভায় সংগঠনের পক্ষ থেকে এই আহ্বান জানানো হয়।
উক্ত সভায় বিসিএসএম কো-চেয়ার সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলছে। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার। বহু অভিবাসন প্রত্যাশী কর্মী এই শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে বিশেষভাবে আগ্রহী। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আগামী সপ্তাহে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন যাতে করে মালয়েশিয়ার বাজার খুললে সেখানে অংশগ্রহণ করতে পারেন। বিসিএসএম হচ্ছে বাংলাদেশ অভিবাসীদের নিয়ে কর্মরত ২৩টি সংগঠনের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংস্থা। সংস্থাটি আজকের এই আলোচনা সভা আয়োজন করেছে, সিভিল সমাজের পক্ষ হতে সরকারকে অনুরোধ করতে যে, এবারের চুক্তিতে যাতে শ্রমিকের স্বার্থ দৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত হয়।
তিনি বলেন, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার মধ্যে যেসব সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি বরং একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী সমঝোতা চুক্তির আদর্শগুলোকে কলুষিত করেছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের সমঝোতা চুক্তির ভেতরে জুড়ে দেওয়া একটি লাইন ‘বাংলাদেশ হতে কোনও রিক্রুটিং এজেন্সি লোক সংগ্রহ ও প্রেরণ করতে পারবে, তা নির্ধারণ করবে মালয়েশিয়ান সরকার’ এই ধারার বলে মালয়েশিয়া হতে ফরেন ওয়ার্কার রিক্রুটমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম পরিচালনার সুযোগে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত একটি ফার্ম এবং বাংলাদেশের কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে। এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম অভিবাসন ব্যয়কে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করে। যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য নিয়োজিত হয় বাংলাদেশি শ্রমিক, তার অনেকগুলোরই চাকরি প্রদানের সক্ষমতা ছিল না। কর্মহীন অবস্থায় বিদেশে অনাহারে-অর্ধাহারে, অথবা দেশের থেকে টাকা নিয়ে অনেকে জীবন নির্বাহ করেছেন।
সভায় বিসিএসএম চেয়ার অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, মালয়েশিয়া যেমন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার, তেমনই এই বাজারে আছে নানারকমের জটিলতা। সামনে আমাদের উপদেষ্টা মালয়েশিয়া যাচ্ছেন, সুতরাং আমরা মনে করেছি যে, তাকে যদি আমরা কিছু গঠনমূলক পরামর্শ দিতে পারি সেটা আমাদের জন্য, দেশের জন্য, অভিবাসী কর্মীদের জন্য ভালো হবে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেই উদ্যোগ নেয় বিষয়টি অনুসন্ধানের। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ সরকার ট্রাফিকিং আইনের অধীনে প্রাথমিক ইনভেস্টিগেশন পরিচালনা করে তার ফলাফলের ভিত্তিতে ২ জন ব্যাক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য, বাংলাদেশ পাঠানোর জন্য, মালয়েশিয়ার হোম মিনিস্ট্রির কাছে চিঠি পাঠায়। সে দেশের হোম মিনিস্ট্রি হতে এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও বিষয়টি নিয়ে অগ্রগতি হয়নি। বিসিএসএম মনে করে, এই বিষয়টির দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। যদি এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে আমরা তৈরি থাকি, তবে বাজার খোলার ক্ষেত্রে অন্য আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি হবে।
সভায় বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, গতবারের সমঝোতা পরিকল্পিতভাবে সই করা হয়েছে, যাতে মালয়েশিয়া সরকার নিজের ইচ্ছামতো রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করতে পারে। অথচ মালয়েশিয়া অন্য ১৪টি দেশ থেকে কর্মী নিয়ে আসে, সেখানে এরকম কোনও শর্ত নাই। বাংলাদেশ ৭৬টি দেশে কর্মী পাঠায়, কোথাও কিন্তু এই ধরনের শর্ত নাই। বিগত সময়ে মন্ত্রী সিন্ডিকেটের স্বার্থ দেখেছেন এবং নিজের স্বার্থ দেখেছেন। সেজন্য আমরা বলতে চাই— গুটি কয়েক ব্যক্তিকে এই সুযোগ দিয়ে ২৫০০ এজেন্সির মধ্যে ২৪০০ এজেন্সি এই বাজারে কাজ করতে পারে নাই। যদি এরকম হতো ওই ১০০ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীরা গিয়ে কাজ করেছে, অল্প টাকায় যেতে পেরেছে, তাহলে আমাদের কোনও কথা থাকতো না। কর্মীরা যাওয়ার পর সমস্যা হয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়েছে।
সভায় আরও মধ্যে বক্তব্য রাখেন মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোর এর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম, কর্মজীবী নারীর নির্বাহী পরিচালক সানজিদা সুলতানা, বায়রার সাবেক সহসভাপতি রিয়াজ উল ইসলাম প্রমুখ।
