
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কীভাবে গুপ্তহত্যা চালায়, তার একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে হামাস নেতা খালিদ মিশালকে ব্যর্থ হত্যাচেষ্টা। ১৯৯৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মোসাদের এজেন্টরা বিষ প্রয়োগ করে তাঁকে হত্যাচেষ্টা চালায়। সেই ঘটনা ইসরায়েল ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতিবাচক ভাবমূর্তিকে উন্মোচন করে। সেই ঘটনা নিয়ে এই লেখা।
১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে ঘটে যায় এক রোমহর্ষ গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতা খালিদ মিশালকে নীরবে হত্যা করতে ছয় এজেন্টের একটি বিশেষ দল জর্ডানের রাজধানী আম্মানে পাঠায়। কিন্তু এই হত্যা পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যায়, আটক হয় দুই এজেন্ট। এটি ছিল মোসাদের সবচেয়ে শোচনীয় ব্যর্থ অভিযান।
ওই ঘটনা খালিদ মিশালের রাজনৈতিক জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছিল। জর্ডানের তৎকালীন বাদশাহ হোসেনের জন্য এ ঘটনা ছিল বড় কূটনৈতিক বিজয়। অন্যদিকে ইসরায়েলকে এই ব্যর্থতার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। খালিদ মিশালকে কেন হত্যা করতে চেয়েছিল ইসরায়েল আর কেনই–বা ব্যর্থ হয়েছিল সেই অভিযান? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে দেখা যাক ২৮ বছর আগে।
প্রতিশোধের ডাক
১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে ইসরায়েলের জেরুজালেমের একটি বিপণিবিতানে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায় হামাস। নিহত হয় ১৬ জন ইসরায়েলি, আহত হয় অন্তত ১৭০ জন। এ হামলার প্রতিশোধ নিতে জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক ডাকেন ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ওই বৈঠকে মোসাদসহ দেশটির অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে হামাসের একজন শীর্ষ নেতাকে হত্যার ব্যাপারে সবাই একমত হন। কিন্তু কাকে হত্যা করা হবে, তা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়। নেতানিয়াহু প্রথম হামাস নেতা মুসা আবু মারজুকের নাম প্রস্তাব করেন। কারণ, সে সময় তিনি ছিলেন হামাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
কিন্তু ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, আবু মারজুক যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী। তাঁকে হত্যা করলে মার্কিন প্রশাসনের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। এমন পরিস্থিতি হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান খালিদ মিশালকে হত্যার প্রস্তাব দেন মোসাদের তৎকালীন পরিচালক ড্যানি ইয়াতোম। সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেন জায়নবাদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।
হত্যার নীলনকশা
খালিদ মিশাল জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। আর এটিই তাঁকে হত্যার ক্ষেত্রে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াল।
খালিদ মিশালকে হত্যাচেষ্টার তিন বছর আগে ১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গে ইসরায়েলের একটি শান্তি চুক্তি হয়। এ চুক্তিতে দুই দেশ একে অন্যের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল।
জর্ডানে অনুপ্রবেশ করে খালিদ মিশালকে হত্যা করলে চুক্তিটি হুমকির মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে শুরুতে খালিদ মিশালের ওপর শুধু নজরদারির নির্দেশ দেন নেতানিয়াহু।
খালিদকে হত্যার অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন মোসাদের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিশকা বেন ডেভিড। তিনি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘শুরুতে আমাদের আম্মানে গিয়ে শহরটি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে এবং হামাসের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।’
খালিদ মিশাল জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। আর এটিই তাঁকে হত্যার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল।
কিন্তু ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলে আরেকটি আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায় হামাস। এতে নিহত হন প্রায় আট ইসরায়েলি, আহত হন অনেকে। এ হামলার পর আর কালক্ষেপণ করলেন না নেতানিয়াহু। অবিলম্বে জর্ডানে ঢুকে খালিদ মিশালকে হত্যার নির্দেশ দেন তিনি। তবে শর্ত হলো, হত্যার অভিযান এতটাই সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত করতে হবে, যাতে জর্ডান ঘুণাক্ষরেও তা টের না পায় এবং দেশটির সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক–সংকট সৃষ্টি না নয়।
হামলার পরিকল্পনা ঠিক করতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন মোসাদপ্রধান ড্যানি ইয়াতোম। সেখানে সিদ্ধান্ত হলো, মিশালকে হত্যার কথিত অভিযানে ছয়জন এজেন্ট অংশ নেবেন। এতে কোনো ধরনের বোমা কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হবে না। একেবারে গোপনে, নীরবে ও কোনো চিহ্ন না রেখে খালিদকে হত্যা করা হবে।
হত্যোকাণ্ড ঘটিয়ে নীরবেই জর্ডান থেকে ইসরায়েলে ফিরে আসবেন মোসাদ এজেন্টরা। এই হত্যাকাণ্ডে একমাত্র অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে বিশেষ একধরনের মারাত্মক বিষ। এটি তৈরি করা হবে মোসাদেরই নিজস্ব ল্যাবে।
এই বিষ কারও শরীরে নিক্ষেপ করা হলে আক্রান্ত ব্যক্তি শুরুতে কিছুই টের পাবেন না। তবে ধীরে ধীরে এটি তাঁর মস্তিষ্কে অক্সিজেন চলাচল বন্ধ করে দেবে এবং তিনি কোমায় চলে যাবেন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হবে। ফলে এটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই মনে হবে।
আম্মানে ছয় মোসাদ এজেন্ট
১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে মোসাদের ছয়জন এজেন্ট বিভিন্ন বিমানবন্দর দিয়ে জর্ডানে প্রবেশ করেন। এর মধ্যে দুজন নিজেদের কানাডার নাগরিক বলে পরিচয় দেন। এরপর তাঁরা সবাই একটি হোটেলে মিলিত হন। শেষবারের মতো পরীক্ষা করে নেন সঙ্গে করে নিয়ে আসা নীরব ঘাতক বিষের বোতল।
মজার ব্যাপার হলো, মোসাদের দলটিতে একজন নারীও ছিলেন। তাঁর কাছেও ছিল তরল ভর্তি একটি বোতল। তবে সেখানে বিষ নয়, বরং ছিল বিষের প্রতিষেধক বা অ্যান্টিডোট।
সঙ্গে করে এই প্রতিষেধক নিয়ে আসার বিষয়টি অবাক করলেও এর পেছনে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। খালিদ মিশালের গায়ে বিষ স্প্রে করার সময় দুর্ঘটনাবশত মোসাদ এজেন্টের গায়ে ওই বিষ এসে পড়লে, তাঁকে বাঁচানোর জন্য ব্যবহার করা হবে এটি। আর সেই কাজটি করবেন ওই নারী এজেন্ট।
আম্মানে পৌঁছানোর পর খালিদ মিশালের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে শুরু করেন মোসাদের এজেন্টরা। এরপর টানা ছয় দিন ধরে তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিবারই নানা কারণে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। অবশেষে ২৫ সেপ্টেম্বর খালিদ মিশালকে হাতের নাগালে পেয়ে যান মোসাদের এজেন্টরা।
১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে মোসাদের ছয়জন এজেন্ট বিভিন্ন বিমানবন্দর দিয়ে জর্ডানে প্রবেশ করেন। এর মধ্যে দুজন নিজেদের কানাডার নাগরিক বলে পরিচয় দেন। এরপর তাঁরা সবাই একটি হোটেলে মিলিত হন। শেষবারের মতো পরীক্ষা করে নেন সঙ্গে করে নিয়ে আসা নীরব ঘাতক বিষের বোতল।
