
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির উত্থান যেমন অভূতপূর্ব, তেমনি এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জন্য ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে কম্পিউটার এবং স্মার্টফোনের মূল উপাদান র্যামের দাম গত দুই বছরে বিপুল হারে বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ২০২৬ সালে প্রযুক্তি পণ্যের বাজারকে অস্থির করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত র্যামের দাম প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো বিশ্বখ্যাত মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন; এখন সাধারণ ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের র্যামের চেয়ে এআই ডেটা সেন্টারের জন্য উচ্চ ক্ষমতার ‘হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি’ উৎপাদনে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। মাইক্রন কোম্পানি গত ডিসেম্বরে ঘোষণা করেছে, তারা তাদের ‘ক্রুশিয়াল’ ব্র্যান্ডের সাধারণ মেমোরি বিক্রি বন্ধ করবে এবং শুধুমাত্র এআই বাজারের চাহিদা পূরণ করবে। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিকল্পের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই চাহিদার কারণে মেমোরি চিপের বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। আমাজন, গুগলসহ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগে তাদের ভবিষ্যৎ মেমোরি চাহিদা ঘোষণা করায় সরবরাহের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে র্যামের দাম বাড়ছে এবং বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
ঢাকার আইডিবি ভবন ও মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের বিক্রেতারা জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসে উচ্চ ক্ষমতার গেমিং ও আরজিবি র্যামের দাম ৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০২৬ সালে সাধারণ ডিডিআর ৪ এবং ডিডিআর ৫ র্যামের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
স্বস্তির খবর হলো, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে মোবাইল আমদানিতে মোট কর কমিয়ে ৪৩.৪ শতাংশ করা হয়েছে, এবং দেশীয় স্মার্টফোন সংযোজন শিল্পের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের উর্ধ্বগতির কারণে ডিভাইসের খুচরা মূল্য কমার সম্ভাবনা সীমিত।
বাংলাদেশের বড় আইটি আমদানিকারকেরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় এলসি খোলার জন্য বেশি পুঁজি প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে কম বাজেটের ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন আমদানি কমে যেতে পারে, যা মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য চিন্তার বিষয়।
কোম্পানি সাইবার-পাওয়ার-পিসির জেনারেল ম্যানেজার স্টিভ ম্যাসন জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে র্যামের দাম আগের তুলনায় প্রায় ৫০০ শতাংশ বেড়ে গেছে। আগে ল্যাপটপ তৈরির খরচের ১৫-২০ শতাংশ র্যামের জন্য যেত, এখন তা ৩০-৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। টেক ইনসাইটসের বিশেষজ্ঞ মাইক হাওয়ার্ড বলেন, একটি ১৬ জিবি র্যামের ল্যাপটপের উৎপাদন খরচ ২০২৬ সালে ৪০–৫০ ডলার এবং স্মার্টফোনের খরচ প্রায় ৩০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশি ক্রেতাদের জন্য সম্ভাব্য প্রভাবও স্পষ্ট। ১৬ জিবি র্যামের ল্যাপটপের দাম স্থানীয় বাজারে ৫,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ৮ জিবি বা ততোধিক র্যামের স্মার্টফোনের দাম ৩,০০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া নতুন ডিভাইসের দাম বেড়ে গেলে সেকেন্ড হ্যান্ড ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনের চাহিদা ও মূল্যও বাড়তে পারে। একই বাজেটে ক্রেতারা এখন কম শক্তিশালী ডিভাইস নিতে বাধ্য হতে পারেন।
পিসি বিশেষজ্ঞ ড্যানি উইলিয়ামস মনে করেন, বাজারের এই অস্থিরতা ২০২৬ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। ক্রেতাদের দুইটি বিকল্প থাকবে, অধিক খরচ করে পছন্দের ডিভাইস কিনে নেওয়া অথবা একই বাজেটে কম শক্তিশালী ডিভাইস বেছে নেওয়া। অনেকেই পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরো কিছু সময় চালিয়ে যেতে পারেন।
বিশ্লেষকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, যাদের ডিভাইসের তৎক্ষণাত প্রয়োজন, তারা দাম বাড়ার আগেই ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন সংগ্রহ করুন। আর যাদের বাজেট সীমিত, তারা পুরনো ডিভাইস আপগ্রেড করে বা আরো কিছু সময় ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামলাতে পারেন।
(KS)
