
দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাতে নতুন সংযোজন হয়েছে ড্রোন যুদ্ধ। যা বিশ্বের প্রথম ড্রোন যুদ্ধ বলে ধারণা করে হচ্ছে। টানা কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের পর গতকাল শনিবার (১০ মে) ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ মে) ভারত অভিযোগ করে, পাকিস্তান তাদের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীরের ভারত-নিয়ন্ত্রিত এলাকা। তবে ইসলামাবাদ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এদিকে পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা গত কয়েক ঘণ্টায় ভারতের ২৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পাল্টাপাল্টি হামলা দুই দেশের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বকে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। যেখানে আর শুধু গোলাবারুদ নয়, মানবহীন যন্ত্র ড্রোন দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলো যখন উভয় দেশকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, তখন এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে। ড্রোন যেকোনো দেশের সীমানা পার হতে পারে নীরবে এবং যার দায় অস্বীকার করাও সহজ।
বুধবার (৭ মে) পাকিস্তান দাবি করে যে ভারতের বিমান হামলা ও সীমান্ত থেকে ছোড়া গোলায় ৩৬ জন নিহত এবং ৫৭ জন আহত হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, পাকিস্তানের গোলাবর্ষণে কমপক্ষে ১৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। ভারত বলছে, পাকিস্তানের ওপর তাদের হামলা ছিল পেহেলগামে ভারতীয় পর্যটকদের ওপর হামলার প্রতিশোধ, যে হামলায় বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়।
বৃহস্পতিবার (৮ মে) পাকিস্তান জানায়, তারা করাচি, লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডিতে ২৫টি ভারতীয় ড্রোন ধ্বংস করেছে। এসব ড্রোন ছিল ইসরায়েলি তৈরি হ্যারপ ড্রোন, যেগুলো প্রযুক্তিগত ও অস্ত্রভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়। ভারত দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার টার্গেট করেছে। যার মধ্যে লাহোরের একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে ড্রোন, লেজার-গাইডেড বোমা ও ইউএভিগুলো সুনির্দিষ্ট ও দূর থেকে হামলার সুযোগ এনে দিয়েছে। ড্রোন দিয়ে শত্রুর রাডার সিস্টেম সক্রিয় করে পরে সেটিকে চিহ্নিত করা যায়, যেমনটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা যাচ্ছে।
ভারতের ড্রোন সক্ষমতা
ভারতের রয়েছে ইসরায়েলি তৈরি আইএআই হারন, সার্চার, হ্যারপি ও হ্যারপ। এর মধ্যে হ্যারপ ড্রোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করে হামলা করতে পারে। ভারত সাম্প্রতিক সময়ে ৩১টি এমকিউ-৯বি প্রিডেটর ড্রোন কিনছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যার দাম প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। এসব ড্রোন ৪০ ঘণ্টা উড়তে পারে এবং ৪০,০০০ ফুট উচ্চতায় কাজ করতে পারে। এ ছাড়া ভারত ‘স্বর্ম ড্রোন কৌশল’ নিয়েও কাজ করছে। যা কিনা একসঙ্গে অনেক ছোট ড্রোন পাঠিয়ে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা।
পাকিস্তানের ড্রোন সক্ষমতা
পাকিস্তানের ড্রোন শক্তি বিশাল ও বৈচিত্র্যময়। এর মধ্যে আছে চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নিজেদের তৈরি ড্রোন। উল্লেখযোগ্য ড্রোনগুলো হলো চীনের সিএইচ-ফোর, তুরস্কের বাইরাকতার আকিঞ্জি ও পাকিস্তানের নিজস্ব বুরাক ও শাহপার। তারা লয়্যাল উইংম্যান ধাঁচের ড্রোনও তৈরি করছে, যেগুলো মানুষের চালানো বিমানের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-পাকিস্তানের এই ড্রোন যুদ্ধ এখনো বড় পরিসরে শুরু হয়নি। এটি এখনো সীমিত ও প্রতীকী মাত্রায় চলছে। ভারতের বিশ্লেষক মনোজ জোশী বলেন, ‘ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে হয়তো বড় সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু এটি পরবর্তী বড় যুদ্ধের ভূমিকা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।’ পাকিস্তানের বিশ্লেষক ইজাজ হায়দার বলেন, ‘এই হামলাগুলো সম্ভবত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, পুরোপুরি প্রতিশোধ নয়। যদি পাকিস্তান সত্যিকারের জবাব দিতে চাইত, তাহলে আরো বড় পরিসরে ও নানা রকম অস্ত্র নিয়ে হামলা করতে পারত।’
ড্রোন ব্যবহারের সুবিধা হলো, এটি সীমিত ঝুঁকি নিয়ে নজরদারি ও আক্রমণ করতে পারে। তবে এর বিপদও রয়েছে— প্রতিটি ধ্বংস হওয়া ড্রোনই পরবর্তী সময়ে উত্তেজনার কারণ হতে পারে। অধ্যাপক ম্যাটিসেকের মতে, ড্রোন যুদ্ধ দুটি দেশের নৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সীমা কমিয়ে দেয়। কিন্তু প্রতিটি আক্রমণ বা প্রতিরোধ নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে যখন দুই পক্ষই পরমাণু শক্তিধর।
